ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্যে টিআইবির উদ্বেগ
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২৬-১০-২০২৬ ০৮:১১:৪৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৬-১০-২০২৬ ০৮:১১:৪৬ অপরাহ্ন
পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) ‘সরকার অনুমতি দিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনে পুলিশ ক্রসফায়ার করবে’—এমন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) টিআইবি থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
সংস্থাটির মতে, এই বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মোকাবিলায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকে অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিপজ্জনক বার্তা দেয়। একে সংবিধান ও আইনের শাসনের প্রতি চরম অবমাননা উল্লেখ করে অবিলম্বে বক্তব্য প্রত্যাহার, আইজিপির জবাবদিহি এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত অবস্থানের পরিপন্থী ঘোষণার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে টিআইবি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিজেদের ব্যর্থতার ঢাল হিসেবে পুলিশপ্রধান কি ঘৃণিত ক্রসফায়ারকে ব্যবহার করতে চান? সরকারের অনুমতি শর্ত জুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেয়ার পথ খোঁজা কি একই সঙ্গে আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি নয়? পুলিশের দায়িত্ব পেশাদার তদন্ত, অপরাধী শনাক্ত এবং গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে বিচারের মুখোমুখি করা। এই বিকল্প হিসেবে ক্রসফায়ার সামনে আনা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা সমাধান হতে পারে না, বরং পেশাগত দেউলিয়াত্বের দৃষ্টান্ত।
আইজিপি একই বক্তব্যে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা বলেছেন, আবার সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ার করার কথাও বলেছেন- এই দুই অবস্থান সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত আইনের আশ্রয়লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নির্বাহী সিদ্ধান্তে বাতিল করা যায় না। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, বিচারপ্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে কাউকে হত্যার এখতিয়ার পুলিশের নেই।’
অতীতের অভিজ্ঞতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘সিনহা হত্যা মামলায় পুলিশ সদস্যদের দণ্ড এবং এই মামলার রায়সংক্রান্ত প্রতিবদনে উঠে আসা ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ এই পদ্ধতির ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দেয়। টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হকের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনায় পরিবারের প্রকাশিত অডিও ও হত্যার অভিযোগও ব্যাপক প্রশ্ন তুলল। আবার নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় সাবেক র্যাব কর্মকর্তাদের দণ্ড আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহারমূলক ব্যবহারকে বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত উদাহরণ। হাজারো অভিজ্ঞতার পর পুলিশের পেশাগত শুদ্ধিসহ রাষ্ট্রসংস্কারের প্রত্যাশার পটভূমিতে পুলিশপ্রধান আবার ক্রসফায়ারকে সম্ভাবনার সামনে এনেছেন। অতীতের অপরাধ থেকে পুলিশ কি শিক্ষা নিয়েছে- এর উত্তর তাকেই দিতে হবে।’
ড. জামান আরও বলেন, ‘পুলিশপ্রধানের এমন বেপরোয়া ও অপরিণামদর্শী বক্তব্য মাঠপর্যায়ে অবৈধ বলপ্রয়োগের প্রচ্ছন্ন ছাড়পত্র হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে। যার দায়িত্ব বাহিনীকে আইনের মধ্য থেকে পরিচালনা করা, তিনি ক্রসফায়ারকে বিকল্প হিসেবে সামনে আনলে তার দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অনিবার্য। যার নেতৃত্বে নাগরিকের জীবন ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত হবে- জনগণ সেই আস্থা রাখবে কীভাবে?
অন্যদিকে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সরকারের সন্ত্রাস দমনে ক্রসফায়ারের পথে যাবে না এবং বিদ্যমান আইন দিয়েই সন্ত্রাস দমন সম্ভব। এরপরও পুলিশপ্রধান কেন সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে ক্রসফায়ারের সম্ভাবনা সামনে এনেছেন? এই অসঙ্গতির ব্যাখ্যা এবং ঘোষিত অবস্থান বাস্তবায়নে তার জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সরকারকে তা স্পষ্ট করতে হবে।’
টিআইবি বলেছে, পুলিশি বলপ্রয়োগ অবশ্যই আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, অস্ত্রের ইচ্ছাকৃত প্রাণঘাতী ব্যবহার কেবল জীবন রক্ষায় কঠোরভাবে অনিবার্য পরিস্থিতিতেই গ্রহণযোগ্য। এই সীমিত সুযোগকে বিচারবহির্ভূত হত্যার অনুমোদন হিসেবে উপস্থাপনের অবকাশ নেই। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অর্থ বা পেয়ে পুলিশের সমালোচনা করার অভিযোগ প্রসঙ্গে সংস্থাটি বলেছে, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। তাছাড়া অভিযোগ মুক্ত গণমাধ্যমের নজরদারি ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা নিরুৎসাহিত করার ঝুঁকি তৈরি করে। পুলিশের কাজের পরিবেশ ও সক্ষমতা নিশ্চিত করার প্রয়োজন সমালোচনা এড়ানোর যুক্তি হতে পারে না।
আইজিপির বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা গ্রহণ, প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া এবং বক্তব্য প্রত্যাহার ও তার প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব থেকে অপসারণের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এইচবি/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স